রোববার (২৮ এপ্রিল) বিকেলে রাজশাহী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের গ্রহণ শাখায় চাঞ্চল্যকর এ মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রাজশাহীর উপ-পরিদর্শক (এসআই) মহিদুল ইসলাম সুজন চার্জশিট দাখিল করেন।
অভিযুক্তরা হলেন- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাহাত মাহমুদ (২১), রাজশাহী কলেজের প্রাণীবিদ্যার চতুর্থ বর্ষের ছাত্র বোরহান কবীর ওরফে উৎস (২২), একই বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আল-আমিন (২০), বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় মেয়াদে ভর্তি প্রার্থী আহসান হাবিব ওরফে রনি (২০), নাইস হোটেলে বয় নয়ন (৩২) ও বখতিয়ার (৩২)। এদের মধ্যে আহসান হাবিব, বোরহান ও নয়ন এরই মধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
জানতে চাইলে রোববার সন্ধ্যায় এসআই মহিদুল ইসলাম বাংলানিউজকে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বিকেলে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এখন মামলাটি পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেবেন আদালত। প্রক্রিয়াটি হচ্ছে, মামলাটির এখন বিচার কাজ শুরু করা হবে। এজন্য নিয়ম অনুযায়ী মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে যাবে বলেও উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম।
এছাড়া ছয়জনকে অভিযুক্ত করে মামলার চার্জশিট দাখিলের কথা বলেন রাজশাহী পিবিআই'র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদও।
তিনি বলেন, গভীর জিজ্ঞাসাবাদ, পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই ও নির্ভুল চার্জশিট তৈরির জন্য দাখিলে এতো সময় লাগলো। আদালতে আজ চার্জশিট দাখিলের মধ্য দিয়ে মামলাটির তদন্ত কাজ শেষ হলো। এখন মামলাটি বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে।
রাজশাহী মহানগর আদালতের পুলিশ পরিদর্শক আবুল হাশেম বাংলানিউজকে বলেন, বিকেলে চার্জশিট গ্রহণ শাখায় জমা হয়েছে। চার্জশিট তার হাতেই রয়েছে। এতে স্বাক্ষর করে দ্রুত আদালতের বিচারকের কাছে উপস্থাপন করবেন তিনি।
এখন আদালতের বিচারকই চার্জশিট গ্রহণ করার ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দেবেন। মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখেই তা জানা যাবে। সিএমএম আদালতে আগামী ৩০ মে মামলার তারিখ ধার্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।
এর আগে ২০১৭ সালের ১৮ মার্চ মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা মহানগরীর বোয়ালিয়া থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক সেলিম বাদশা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, হোটেলকক্ষে প্রেমিক মিজানুর রহমান তার প্রেমিকা সুমাইয়া নাসরিনকে ধর্ষণ করেন। এরপর তাকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন।
তবে আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ না করে নতুন করে মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপরই রহস্য উন্মোচিত হয়। ঘটনার প্রায় দেড় বছর পর পুলিশের এই তদন্ত সংস্থার ফাঁদে ধরা পড়েন তারা। বের হয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক সব তথ্য।
নিহত মিজানুর রহমান (২৪) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইসলামের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। আর সুমাইয়া নাসরিন (২৩) ছিলেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তিনি বগুড়া সদরের উপশহর এলাকার অধিবাসী পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল করিমের মেয়ে। মিজানুরের বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার পাঠানপাড়া গ্রামে। তার বাবার নাম উমেদ আলী।
তিনি একজন কৃষক। সুমাইয়া ও মিজানুরের মরদেহ উদ্ধারের পর সুমাইয়ার পুলিশ কর্মকর্তা বাবা আবদুল করিম বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তার চার্জশিট দাখিলের পর তিনি আদালতে নারাজি দিয়েছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত তদন্তের জন্য মামলাটি পিবিআইতে দিয়েছিলেন।
এর আগে ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল রাজশাহী মহানগরীর সাহেববাজার এলাকার অভিজাত হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের ৩০৩ নম্বর কক্ষে ঠাণ্ডা মাথায় প্রেমিক জুটি মিজানুর ও সুমাইয়াকে হত্যা করা হয়। প্রেমের প্রতিশোধ নিতে তাদের খুন করা হয় পরিকল্পিতভাবেই। ক্রাইম পেট্রোল দেখে খুনের পর স্বাভাবিক থাকার কৌশল রপ্ত করেছিলেন খুনিরা। দেড় বছর ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তবে একটি ফোনকলের সূত্র ধরে পিবিআই তাদের একে একে গ্রেফতার করে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তিন বছর পর তাদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল হলো।
রনি তার জবানবন্দিতে বলেছিলেন, মিজানুরের সঙ্গে তার পূর্ব পরিচয় ছিল। আর রাহাতের সঙ্গে ছিল বন্ধুত্ব। রাহাতের সঙ্গে সুমাইয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরে মিজানুরের সঙ্গে নতুন করে তার প্রেমের সম্পর্ক হয়। এ নিয়ে রাহাত প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। এরই মধ্যে মিজানুরের সঙ্গে দেখা করতে সুমাইয়া রাজশাহী আসছিলেন।
সে সময় মিজানুর ফোন করে রনির কাছে জানতে চান, শহরের কোন হোটেলে উঠলে ভালো হয়। রনি তাকে হোটেল নাইসে ওঠার পরামর্শ দেন। মিজানুর-সুমাইয়া ওই হোটেলে উঠলে পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুই হোটেল বয়ের সহযোগিতায় তাদের কক্ষে প্রবেশ করেন রাহাত, রনি, আল-আমিন ও উৎস।
এরপর প্রথমে মিজানুরের গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে দুই হাত বাঁধা অবস্থায় তার মরদেহের গলায় ফাঁস লাগিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। পরে সুমাইয়াকে তারা চারজন ধর্ষণ করেন। কিন্তু পুলিশের মেয়ে বলে ঘটনা ফাঁস হওয়ার ভয়ে তারা তাকেও মুখে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। পরে ঘটনাটি ‘আত্মহত্যা’ প্রমাণ করতে কৌশলে ভেতর থেকে ওই কক্ষে তালা দিয়ে একটি ফাঁক দিয়ে পালিয়ে যায়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন ওই কক্ষ পরিদর্শনে যাওয়া প্রথম পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, মিজানের মৃতদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝোলানো থাকলেও তার দুই হাত ওড়না দিয়ে বাঁধা ছিল। তার প্যান্টটি কোমর থেকে ভাঁজের মতো করে নিচে নামানো ছিল। দেখেই মনে হচ্ছিল, কেউ একজন টান দিয়ে নামিয়েছে।
এছাড়া মিজানুরের গলার দুই পাশে দাগ ছিল। আত্মহত্যা করলে সেই দাগ একদিকে হওয়ার কথা। এসব চিহ্ন দেখে তখনই তার মনে হয়েছিল এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাছাড়া হোটেল কক্ষে তিন ধরনের সিগারেটের ফিল্টার পাওয়া যায়। একই মানুষ তিন ধরনের সিগারেট খেতে পারেন না। দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআই'র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শে ‘ক্লু লেস’ একটি ঘটনার তদন্ত নিয়ে এভাবেই এগিয়ে নিয়ে যান তিনি।
এসআই মহিদুল বলেন, দুই হোটেল বয়কে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে হাত করেছিলেন মামলার বাকি চার আসামি। তাই সুমাইয়া ও মিজানুর যাওয়ার পর পরিচ্ছন্নতার কাজের নামে কক্ষে প্রবেশ করে এসি রাখার স্থান ভেতর থেকে ফাঁকা করে দিয়েছিলেন দুই হোটেল বয়।
এরপর ওই চারজন দেয়ালের ফাঁকা স্থান দিয়েই কক্ষে প্রবেশ করেন। তখন মিজানুর কক্ষে ছিলেন না। তারা সুমাইয়াকে দিয়ে ফোন করিয়ে মিজানুরকে কক্ষে ডেকে আনেন। এরপর চারজন মিলে ঠাণ্ডা মাথায় শারীরিক প্রতিবন্ধী মিজানুরকে হত্যা করেন। ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে হত্যার পর মিজানুরের ফেসবুক আইডি থেকে আত্মহত্যার একটি পোস্টও দেওয়া হয়। দু’জনকে হত্যার পর তারা দেয়ালের এসি রাখার ফাঁকা স্থান দিয়েই বেরিয়ে যান। আর কক্ষের দরজা ভেতর থেকেই বন্ধ থাকে। ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেল ‘সনি টিভি’র ক্রাইম পেট্রোল দেখে খুনের পর স্বাভাবিক থাকার এই কৌশল রপ্ত করেছিল তারা।
ভেবেছিল তাদের চতুরালি কেউ ধরতে পারবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। ঘটনার প্রায় দেড় বছর পর পিবিআই টিমের ফাঁদে ধরা পড়ে তারা। এ সময় আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে জোড়া খুনের এমনই রোমহর্ষক বর্ণনা দেন তারা।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মহিদুল ইসলাম জানান, একটি ফোনকলের সূত্র ধরে প্রথমে রনিকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজশাহীর দু’টি ছাত্রাবাস থেকে বাকি তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়।
এরপর তাদের তথ্যমতে দুই হোটেল বয়কে গ্রেফতার করা হয়। আসামিদের মধ্যে হোটেল বয় বখতিয়ার ছাড়া বাকি সবাই উচ্চ আদালত থেকে জামিনে আছেন। চার্জশিট দাখিল পর্যন্ত তাদের জামিনের শর্ত রয়েছে আদালতের। ফলে আদালতে চার্জশিট গৃহীত হলে জামিনে থাকা আসামিদের আবারও আত্মসমর্পণ করতে হবে।
তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মামলা একটি হলেও অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে দু’টি। মূল অভিযোগপত্র ধরা হয়েছে সুমাইয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা। এর সঙ্গে আরেকটি অভিযোগপত্র যুক্ত করা হয়েছে মিজানুরকে হত্যার। দু’টি অভিযোগপত্রেই ছয়জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে দুই হোটেল বয়ের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যা কিংবা ধর্ষণের অভিযোগ নেই। এসব অপরাধে সহায়তার অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে।
২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল রাজশাহীর হোটেল নাইসের ৩০৩ নম্বর কক্ষ থেকে ওই দুই তরুণ-তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এ ঘটনায় সুমাইয়ার বাবা এসআই আব্দুল করিম বাদী হয়ে বোয়ালিয়া থানায় মামলাটি করেছিলেন। মামলায় আসামি করা হয়েছিল অজ্ঞাতদের।
বাংলাদেশ সময়: ২০৫৪ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৮, ২০১৯
এসএস/জেডএস