সোমবার (২৮ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদ অধিবেশনে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদ, শ্রীলঙ্কার গির্জা ও হোটেলে সন্ত্রাসী হামলা এবং ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ এবং এ সকল সন্ত্রাসী যৌন নিপীড়নের ঘটনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল সংসদ, সরকার ও নাগরিকদের প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে আনীত সাধারণ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, এ ধরণের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের ঘটনা মেনে নেয়া যায় না।
ফেনীর ছাত্রী নুসরাত হত্যাকাণ্ডসহ যৌন নিপীড়নের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রণয়ন করা হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারাই এ ধরণের ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। জড়িতরা কে কোন দলের তা দেখা হবে না। যৌন নিপীড়ন যারা করবেন তাদেরও রেহাই নেই। অনেকেই কঠোর আইনের কথা বলেছেন। প্রয়োজন হলে আরও কঠোর আইন আমরা করবো। তাদের যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয় সেই ব্যবস্থাই আমরা করবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিপূর্ণ দেশ নিউজিল্যান্ডেও একজন খুনি ক্যামেরা মাথায় নিয়ে নামাজ পড়া অবস্থায় ৫৩ জন মুসলিমকে হত্যা করে। সে একজন উগ্রবাদী খ্রিস্টান ছিল। আমাদের জাতীয় ক্রিকেট টিমের সদস্যরা অল্পের জন্য বেঁচে যান। ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ যৌন নির্যাতন করে। মামলা প্রত্যাহার করতে প্রচন্ড চাপ দেয়া হয়। সাহসী মেয়ে নুসরাত তাতে রাজি হয়নি। এ কারণে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার পর সেই মেয়েটাকে চরিত্রহীন বানানোর চেষ্টা করা হয়। অধ্যক্ষের সঙ্গে আমাদের দলের কয়েকজন জড়িত ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দেই, গ্রেফতার করা হয়। কারণ অপরাধী অপরাধীই। সে যে দলেরই হোক।
তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী সমস্যা। শ্রীলঙ্কায় বোমা হামলায় নিষ্পাপ শিশু জায়ান চৌধুরী নিহত হয়। প্রায় ৪২ জন বিদেশি মারা যায় ওই ভয়াবহ হামলায়। আত্মঘাতি সন্ত্রাসীরা এই হামলা করেছে। এ ধরণের জঘন্য ঘটনার আমরা নিন্দা জানাই। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রতিটি জনগণকে আহ্বান জানাবো, সকলকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে। হলি আর্টিজানে হামলার পর আমরা কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি। গোয়েন্দা সংস্থা সঠিক সময়ে সংবাদ দিতে পারছে বলেই অনেক জীবন রক্ষা পাচ্ছে।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোথাও এবং কারও বিরুদ্ধে কোন অস্বাভাবিক ঘটনা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীকে জানাবেন। যাতে আমরা পদক্ষেপ নিতে পারি। আমিও ২১ আগস্ট ভয়াল হামলার শিকার হয়েছিলাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ আমার পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাওয়ার অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়েছিল। খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল। যে দেশে খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়, সে দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বৃদ্ধি পাবে এটাই স্বাভাবিক। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রহসনের নির্বাচন করে খালেদা জিয়া খুনি রশিদকে বিরোধী দলের আসনে বসিয়েছিলেন। জিয়া-এরশাদও খুনিদের পুরস্কৃত করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, কারো আপনজন মারা গেলে তারা বিচার চায়। কিন্তু আমরা যারা পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছিলাম, আপনজনদের বিচার চাওয়ার অধিকারও আমাদের ছিল না। বুকে পাথর বেঁধে সংগ্রাম করেছি, ক্ষমতায় এসে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করিনি। ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের ব্যবস্থা করেছি। আর এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটুক তা চাই না। দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবেলা করার পাশাপাশি সারাবিশ্বেই জনমত গড়ে তুলতে হবে।
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তিনি বলেন, আমরা অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। জঙ্গিবাদ দমনে যা যা করার দরকার তা করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এ ধরনের হামলা করে তাদের কোনো ধর্ম নেই। যারা এসব করে তারা নিজের ধর্মও মানে না। আল্লাহ-রাসূল মানলে তারা নিজেরা হত্যা করতো না। ইসলাম ধর্ম পবিত্র ও শান্তির ধর্ম। কে মুসলমান তা বিচার করার দায়িত্ব কারও নেই। কোরআনে এটা বলা নেই, কে মুসলমান কিংবা কে মুসলমান নয় তার বিচার মানুষ করবে। এই বিচার করবেন আল্লাহ। যে এ ধরনের বিচার করতে যায়, সে তো আল্লাহকেই মানে না। তাই শান্তির ধর্মকে কলুষিত করা, এটা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।
বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাসের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালেও বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করেছে, মা-বোনদের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়েছে। বিএনপি-জামায়াত যদি অগ্নিসন্ত্রাস করে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা না করতো, তবে ওই অধ্যক্ষের মাথায় হয়তো নুসরাতকে ওইভাবে পুড়িয়ে হত্যার চিন্তা আসতো না। তাই এসব সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও অগ্নিসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর রয়েছে। মানুষকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও জঙ্গি-সন্ত্রাসের সামান্যতম আলামত পেলে সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তুলতে হবে। আর যেন কোনো সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ না থাকে। বাংলাদেশকে উন্নত ও শান্তির দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
বাংলাদেশ সময়: ২৩৩৯ ঘণ্টা, এপ্রিল ২৯, ২০১৯
এসকে/এসএ