ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির প্রভাব ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে পড়ে গেছে। তবে এই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কেবল ব্যবসা ও বাণিজ্যেই নয়, খেলাধুলার জগতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিনিয়োগ, স্পনসরশিপ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এবং ক্রীড়া সামগ্রীর বাজারে এর ঢেউ কতটা সুদূরপ্রসারী হবে, তা নিয়ে এখনই নানা প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বিনিয়োগ ও স্পনসরশিপের ভবিষ্যৎ
আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের দুটি বৃহৎ আয়োজন করতে যাচ্ছে—২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ এবং ২০২৮ সালের লস অ্যাঞ্জেলস অলিম্পিক ও প্যারা-অলিম্পিক গেমস। এসব আয়োজন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মার্কিন বাজারে নিজেদের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার বড় সুযোগ এনে দেয়।
তবে ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি অনেক বিদেশি সংস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়ার গাড়ি নির্মাতা হুন্দাই ফিফার সঙ্গে স্পনসরশিপ চুক্তির আওতায় বিশ্বকাপে প্রচারণার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কঠোর বাণিজ্য নীতির কারণে তাদের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।
ক্রীড়া ইভেন্ট বিশেষজ্ঞ জন জেরাফা বলেন,"অনেক স্পনসর এখন হিসাব কষছে—যদি মার্কিন বাজারে পণ্য বিক্রি করাই কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের যৌক্তিকতা কোথায়?"
এছাড়া, নাইকি, অ্যাডিডাস এবং পুমার মতো বিশ্বখ্যাত ক্রীড়া পোশাক প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলোও সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ তাদের পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল ও কারখানা প্রধানত এশিয়ায় অবস্থিত, যেখানে ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে। ইতোমধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম হ্রাস পেয়েছে, যা বোঝাচ্ছে যে, আমদানি ব্যয় বাড়লে ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দামও বাড়তে পারে।
তবে ক্রীড়া অর্থনীতিবিদ কিয়েরান ম্যাগুয়ের মনে করেন, প্রভাব সীমিত থাকবে। তার মতে, "যদি ১০০ ডলারের একটি ক্রীড়া জার্সি যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হয় এবং উৎপাদন খরচ হয় ১২-১৫ ডলার, তাহলে শুল্ক বৃদ্ধির ফলে এটি বড় কোনো সমস্যা সৃষ্টি করবে না। "
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব
ট্রাম্পের শুল্ক নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ, যা যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে। সম্প্রতি ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর ২৫% শুল্ক আরোপ করবেন। এতে তিন দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিশ্বকাপ আয়োজনের সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ট্রাম্প অবশ্য মনে করেন, এই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্বকাপকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। তবে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি উল্টো প্রতিযোগিতার সৌন্দর্য নষ্ট করতে পারে।
এছাড়া, ট্রাম্প এর আগে কানাডাকে ‘৫১তম রাজ্য’ বানানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যার ফলে কানাডীয় দর্শকরা এনবিএ ও এনএইচএল ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় দুয়োধ্বনি দিয়েছেন। বিশ্বকাপেও এমন পরিস্থিতি দেখা দিলে, আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে এটি নেতিবাচক বার্তা দেবে।
ক্রীড়া সামগ্রীর বাজারে পরিবর্তন
ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি বিশ্বব্যাপী ক্রীড়া সামগ্রীর আমদানি-রপ্তানিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রীড়া সামগ্রী আমদানি করে বা সেখানে রপ্তানি করে, তারা নতুন শুল্ক নীতির ফলে বাড়তি খরচের সম্মুখীন হতে পারে।
তবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের মতো সংস্থাগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সম্প্রচার চুক্তি (২ বিলিয়ন পাউন্ড) একটি পরিষেবা হিসেবে বিবেচিত হয়, যা শুল্কের আওতায় পড়ে না। তবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে, টিকিট বিক্রি ও টিভি সাবস্ক্রিপশনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সবমিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি যে কেবলমাত্র বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে তা নয়, এটি ক্রীড়া জগতেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনতে পারে।
স্পনসরশিপ, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আবহ, ক্রীড়া পণ্যের বাজার—সবকিছুর ওপর এই নীতির ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করেই ঠিক হবে, ক্রীড়াঙ্গনে এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গন এখন নতুন এক অনিশ্চিত সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র- বিবিসি
বাংলাদেশ সময়: ১৩০১ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৪, ২০২৫
এমএইচএম