ঢাকা: ঈদের দুইদিন পরও নাড়ির টানে বাড়ি যাচ্ছে নগরবাসী। তবে যাত্রীদের চিরচেনা উপচেপড়া ভিড় নেই।
নানা ব্যস্ততায় ঢাকা ছাড়তে না পারায় ঈদের পরে এখন বাড়ি যাচ্ছেন অনেকে। তাদের নিয়ে ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ছুটছে ট্রেন। আজকে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ৭১টি ট্রেন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাচ্ছে। ছেড়ে যাওয়া ট্রেনগুলোতে যাত্রীদের চাপ ছিল মোটামুটি।
বুধবার (০২ এপ্রিল) রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।
রেলস্টেশনে সরেজমিনে দেখা যায়, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে লম্বা সরকারি ছুটি থাকায় যাত্রীরা এখনও বাড়ি ফিরছেন। নাড়ির টানে বাড়ি যেতে পরিবার পরিজন নিয়ে অনেকেই কামলাপুর রেল স্টেশনে উপস্থিত হয়েছেন। কারো হাতে অগ্রিম টিকিট, আবার কারো হাতে ব্যাগ কিংবা লাগেজ। অনেকে সন্তান নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। কেউ যাচ্ছেন সিলেট, বগুড়া, কেউ যাচ্ছেন রাজশাহী, দিনাজপুর, জামালপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, কিশোরগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লা।
এছাড়া কমলাপুর থেকে ৭১টি ট্রেন দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে। সকাল থেকে শিডিউল অনুযায়ী ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে। আজও রেলস্টেশনের প্লাটফর্মগুলোতে যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়নি। যাত্রীরা ধীরে-সুস্থে ট্রেনে উঠছেন। ট্রেনগুলো যাত্রীতে পরিপূর্ণ ছিলো। আজও স্ট্যান্ডিং টিকিট দেওয়া হয়েছে। স্টেশনে কাজ করা কুলি ও শ্রমিকরা আজও কাজে ব্যাস্ত। তারা যাত্রীর ব্যাগ টেনে নিয়ে যাচ্ছে নিদিষ্ট ট্রেনে।
সিলেটের উদ্দেশে কমলাপুর স্টেশন ছাড়ার আগে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসের যাত্রী হারুন উদ্দিন মামুন বাংলানিউজকে বলেন, ঈদের মৌসুমে এবারের মত সুন্দর ও শান্ত পরিবেশ কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আগে দেখিনি। একটু নির্বিঘ্নে যাতায়াতের জন্য ট্রেনে ভ্রমণ করি। শুধু ঈদ নয়, এমন ঝামেলামুক্ত ট্রেন ভ্রমণ যেন সবসময় থাকে।
বগুড়া যাচ্ছেন ঢাকায় একটি কাপড়ের দোকানোর কর্মচারী মো. আশরাফুল। তিনি বাংলানিজকে জানান, ঈদের দিন পর্যন্ত দোকানে কাপড় বেচাবিক্রি করেছি। এরপর পরিবারের জন্য কিছু কেনাকাটা ও দরকারি জিনিসপত্র নিতে নিতে দেরি হয়ে গেছে। তাই এখন বাড়ি যাচ্ছি। বাড়ি গিয়ে সবার সঙ্গে দেখা হবে, সময় কাটাবো, এটাই আনন্দ।
জামালপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রী মো. আব্দুল্লাহ বাংলানিউজকে বলেন, ঢাকাতে পরিবারের সকলের সঙ্গে ঈদ করেছি। এখন জামালপুর শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছি। এবার ছুটি বেশি থাকায় একটু ঘুরতে পারছি। এছাড়া ট্রেনের টিকিট নিয়ে কোনো ঝামেলা হয়নি। একবার চেষ্টার পরই টিকিট পেয়েছি। ট্রেন ফাঁকা আছে, তাই পরিবার নিয়ে শান্তিতেই যেতে পারব। আগামী শনিবার ঢাকায় ফিরব। রোববার থেকে আবার কাজে যোগ দেব।
মায়ের টানেই কিশোরগঞ্জ যাচ্ছেন গার্মেন্টসকর্মী মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, এ বছর ভাবছিলাম গ্রামে যাবো না। ঢাকাতেই ঈদ করেছি। বাড়ি থেকে মা বার বার ফোন দিচ্ছেন বাড়িতে যাওয়ার জন্য, তাই আর থাকতে পারলাম না। বাড়িতে দুইদিন থেকে আবার চলে আসবো। আসলে বাড়ি না যাওয়ার কারণ ঈদের আগে কাজটা চলে গেছে। হাতে টাকা নেই। কি নিয়ে বাড়ি যাব! লজ্জায় যেতে পারিনি। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটা গার্মেন্টসে কাজ করতাম। হঠাৎ মালিক বললো আমাদের কয়েকজনের কাজ নেই। মালিকের নাকি লস হয়েছে।
কমলাপুর স্টেশনে দীর্ঘদিন কুলির কাজ করেন রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এবছর লম্বা ছুটি থাকায় মানুষ যেমন ধীরে ধীরে বাড়ি যাচ্ছে আবার ফিরবেও ধীরে ধীরে। আজ থেকে ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। সকালে অনেকটা চাপ ছিল, এখন একটু কম। তবে বিকেলে আবার ঢাকায় ফেরা মানুষের চাপ বাড়বে। এদিকে আজকে ঢাকা থেকে মানুষ কম বের হচ্ছে। যারা ঈদের আগে বাড়ি যেতে পারেনি তারা এখন যাচ্ছে। এখন ঢাকার ফেরার যাত্রী বেশি। তাই আমাদের কাজও একটু বেশি।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত ঈদে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে সবচেয়ে বেশি ঘরমুখো মানুষ ট্রেনে ঈদযাত্রা করেন। এ কারণেই বাড়তি নজর রয়েছে কমলাপুরে। ঈদযাত্রায় আন্তঃনগর, মেইল, কমিউটার মিলে প্রতিদিন ৭০ হাজারের বেশি যাত্রী পরিবহন করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ঈদযাত্রায় সব ট্রেন সঠিক সময়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। ঈদযাত্রায় প্রতিদিন ৭১টি ট্রেন চলাচল করছে। এ কয়দিন কমলাপুর স্টেশনে টিকিট ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। আজ ২ এপ্রিল থেকে ফিরতি যাত্রা শুরু হয়েছে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, এবছর ঈদযাত্রায় স্টেশনের শুরু থেকে ট্রেনের গন্তব্য পর্যন্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। টিকিট যাচাইয়ের জন্য ভেরিফিকেশন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ট্রেনের সময়সূচি ঠিক রাখতে এবং যাত্রীদের সুবিধার্থে ঢাকাগামী ৯টি ট্রেনের বিমানবন্দর স্টেশনের যাত্রাবিরতি বাতিল করা হয়েছে। ঢাকামুখী ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামলাতে জয়দেবপুর স্টেশন থেকে ঢাকামুখী এবং ঢাকা স্টেশন থেকে জয়দেবপুরমুখী ট্রেনে টিকিট ইস্যু বন্ধ রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে, ঈদযাত্রা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও উৎসবমুখর করতে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। টিকিট কাউন্টার, প্ল্যাটফর্মসহ সব জায়গায় র্যাব, পুলিশ, আনসার সদস্যের পাশাপাশি রেলওয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীও ছিল।
এ বিষয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনের কর্মকর্তা (স্টেশন মাস্টার) আনোয়ার হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, আজও সকাল থেকে ঈদের ফিরতি যাত্রা শুরু হয়েছে। সকাল থেকেই নির্ধারিত সময়ে ফিরছে ট্রেন। সকাল থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় ফিরেছে ৩৫টির মতো ট্রেন। তবে ট্রেনগুলোতে যাত্রী ছিল স্বাভাবিক। মূলত আগামী বৃহস্পতিবার, শুক্র ও শনিবার ফিরতি যাত্রার চাপ পড়বে। এছাড়া ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে রাজশাহীগামী ধুমকেতূ এক্সপ্রেস, এগারো সিন্ধুর প্রভাতী, তিস্তা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী, অগ্নিবীণাসহ বেশ কয়েকটি ট্রেন কমলাপুর থেকে নির্ধারিত সময়ে ছেড়েছে। শুধু একটি ট্রেন এক ঘণ্টা লেট করেছে। ট্রেনে এবারের ঈদযাত্রা খুবই স্বস্তিদায়ক হয়েছে।
উল্লেখ, রাজধানীতে বিরাজ করছে ছুটির আমেজ। এবারের রোজার ঈদে সরকারি ছুটি ৯ দিন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্র ও শনিবার। এবার ২৮ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু শেষ হবে ০৫ এপ্রিল।
বাংলাদেশ সময়: ১৬৫৮ ঘণ্টা, এপ্রিল ০২, ২০২৫
জিসিজি/এসএএইচ