ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ চৈত্র ১৪৩১, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৪ শাওয়াল ১৪৪৬

জাতীয়

মঙ্গল শোভাযাত্রার আঁতুড়ঘরে উৎসবের প্রস্তুতি

সরোয়ার হোসেন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ০৭৩৩ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০২৫
মঙ্গল শোভাযাত্রার আঁতুড়ঘরে উৎসবের প্রস্তুতি

যশোর: ঈদুল ফিতরের পর পরই বাংলা বর্ষবরণ উৎসবে শামিল হবে দেশের মানুষ। যে উৎসব হবে ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী নির্বিশেষে প্রাণের ঐকতান।

আবারও রং, রূপ, জৌলুসে স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে উঠবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। যার সূচনা হয়েছিল যশোরের শিল্পী মাহবুব জামাল শামিম ও তার প্রতিষ্ঠান চারুপীঠ আর্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ১৯৮৫ সালে।

এবারও মাহবুব জামাল শামিমের নেতৃত্বে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। প্রতিদিন সকাল, বিকেল, রাতে কাজ করছেন শিল্পীরা। তৈরি করছেন নানা উপকরণ। মঙ্গল শোভাযাত্রার চার দশক পেরিয়ে পাঁচ দশকে পদার্পণের আয়োজনে চারুপীঠ থিম করেছে ‘যতনে রাখি ধরণীরে’।

সরেজমিনে পারুপীঠ কার্যালয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি দেখা যায়। সেখানে কথা হয় মাহবুব জামাল শামিম ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশিদের সঙ্গে।

তারা জানান, বিধ্বংসী নানা কর্মকাণ্ড থেকে পরিবেশ, প্রতিবেশ আর প্রাণিকূলকে রক্ষায় সচেতনতার বার্তা তুলে ধরা হবে যশোরের এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। যেখানে থাকবে বন, বনের প্রাণি যেমন বাঘ, হরিণ, হাতি, ঘোড়া, পাখপাখালি, পাহাড়, নদী ইত্যাদি।

অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের মতো সেজে হৈ-হুল্লোড় করে, নেচে, গেয়ে পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলবেন। শুরুর ধারাবাহিতকা অব্যাহত রেখে দলমতনির্বিশেষে যশোরের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেবেন। পুরো আয়োজনকে সার্থক করতে ৩২টি সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাউল শিল্পীরা থাকবেন। অংশগ্রহণকারীদের মাথায় থাকবে পাতা দিয়ে তৈরি করা টুপি।

চারুপীঠের সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রশীদ বলেন, রোজার প্রথম থেকেই কাজ শুরু হয়েছে। কর্মশালার মাধ্যমে সংগঠনের শিল্পীরা স্ট্রাকচারগুলো তৈরি করছেন। ঈদের পরই শুরু হবে রঙের কাজ।

মাহবুব জামাল শামিম বলেন, পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রায় সব সৃজনশীলতা একসঙ্গে জ্বলে উঠবে। এখানে ঘটবে নাচ, গান, নাটক, যাত্রাসহ বাঙালি সংস্কৃতির সব ধারার সম্মিলন। নদীতে জেলের মাছধরা, বাউলিয়ানা, জারি, সারি, ভাটিয়ালিতে মাতোয়ারা হয়ে পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা তুলে ধরবেন অংশগ্রহণকারীরা। একটা বিশাল দৃশ্যমান ক্যানভাসে সবকিছু জীবন্ত ফুটিয়ে তোলার জন্য কর্মযজ্ঞ চলছে। শোভাযাত্রাটি যখন রাস্তায় বের হবে তখনই আসলে বোঝা যাবে যে কী হয়েছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ, বিগ্রহ, হানাহানি, দখলদারিত্বের কবলে পড়ে পরিবেশ দ্রুতই ধ্বংসের দিকে চলে যাচ্ছে। অথচ, এদিকে কারো কোনো নজর নেই। কেউই বুঝতে চাচ্ছে না যে পরিবেশ না বাঁচলে রাজনীতি, ক্ষমতা, সভ্যতা-সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। অথচ, এদিকে কারো কোনো খেয়াল নেই। সে কারণে চারুপীঠ যশোর এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার থিম করেছে পরিবেশ নিয়ে ‘যতনে রাখি ধরণীরে’।

পহেলা বৈশাখ সকাল আটটায় চারুপীঠ যশোর কার্যালয় চত্বর থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়ে মূল আয়োজনে মিলিত হবে হবে বলে জানান সংগঠনের নেতারা।

বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন জাতিসংঘের ইউনেস্কো স্বীকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। এর সূচনা হয়েছিল ১৯৮৫ সালে চারুপীঠ যশোর থেকে। শুরুর বছরে এর নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। আর উদ্যোক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে সদ্য পাশ করা মাহবুব জামাল শামিম। তার সঙ্গে ছিলেন বন্ধু শিল্পী হীরন্ময় চন্দ্রসহ আরও কয়েকজন।

প্রথম বছরেই আনন্দ শোভাযাত্রা যশোরবাসীর অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে এমন সাড়া ফেলেছিল যে, তার আর চারুপীঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ঠিক পরের বছরেই এখানে সম্মিলিতভাবে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে তা পালিত হয়। শোভাযাত্রার জন্য যাবতীয় উপকরণ তৈরি করেছিলেন চারুপীঠ যশোরের শিল্পীরা।

অন্যদিকে, দলমতনির্বিশেষে সব পর্যায়ের মানুষ এ আয়োজনে যুক্ত হয়েছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে মঙ্গল শোভাযাত্রা সত্যিকার অর্থেই মাঙ্গলিক এক বিনোদনের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। বাংলা ১৪০০ বর্ষবরণ উৎসবের ইতিহাসতো সবার জানা। যা যশোরের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে সৃষ্টি করেছিল এক নতুন মহাকাব্য।

১৯৮৮ সালে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্য মাহবুব জামাল শামিম এবং হিরন্ময় চন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তি হন। তাদের প্রচেষ্টায় ১৯৮৯ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটির চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা বের করেন আনন্দ শোভাযাত্রা। ১৯৯০ সালে এসে আনন্দ শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য়। এ মঙ্গল শোভাযাত্রা ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের নানা প্রান্তে। এখন যা বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম প্রধান আকর্ষণীয় ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। শোভাযাত্রা বের হচ্ছে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকেও। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যে মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন স্থান করে নিয়ে বিশ্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও।

শুরুর কথা প্রসঙ্গে মাহবুব জামাল শামিম বলেন, ব্রাহ্মণ্যবাদের নিষ্পেশন, সামন্ত যুগ ও উপনিবেশিক যুগের দুষ্ট মননের শাসন চলেছে হাজার বছর কাল। আমাদের গার্হস্থ্য জীবনের প্রতিটা প্রয়োজনীয় সামগ্রী, পাত্র, আসবাবপত্র, পোশাক, স্থাপত্য, জল-স্থলের যানবাহনের কারুকার্য, শিশুর মনোরঞ্জনে খেলনা পুতুল সব-সব কিছুরই নির্মাণে, রূপে, গড়নে, রঙে রাঙিয়ে জীবনকে উপভোগ্য করে এসেছেন আমাদের লোকজ শিল্পীরা। বহমান সমাজের রুচির নির্মাতা, তারা সবাই গ্রাম্য মানুষ। এই নগর তাদের অর্থে, মর্যাদায় বঞ্চিত আর অসম্মানের পাত্র বিবেচনা করে এসেছে।

নিগৃহীত পঁচানব্বই ভাগ গ্রাম্য মানুষের মাঝে লালিত দেশজ কৃষ্টি। তাকেই আজ আমরা আদরে নয়ন মেলে দেখছি। শিল্প মর্যাদায় অনুভব করছি। তারই প্রাণবন্ত অথৈ জলের ধারা আজ স্বাধীন বাংলাদেশের নগরের মাঝ দিয়ে মৃত্তিকা ভেঙে যেন নদী হয়ে আশ্চর্য সুন্দর দেশজ কৃষ্টির রাজসিক উৎসব মঙ্গল শোভাযাত্রা। যা স্বগৌরবে মিলেছে সভ্যতার মহাসাগরে।

একুশের প্রভাতফেরি থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রার চিন্তা মাথায় আসে জানিয়ে এ শিল্পী বলেন, বাংলা ভাষার রাষ্ট্রের আন্দোলনে তারুণ্যের রক্তে গড়া একুশের পথ ধরে আমাদের ভাষা স্বাধীনতা। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবার মিলন। এ একুশের প্রভাতফেরিকেই যেন ফেলে আসা সব শিল্প ঐতিহ্যের সম্ভারে সাজিয়ে এ উৎসব রচনা করা হয়েছিল।

মাহবুব জামাল শামিম বলেন, নব নব রূপে রসে আমরা মঙ্গল শোভাযাত্রা রচনা করে যাব। ঐতিহ্যের শেকড় হতে রং, রূপ, রসে সিক্ত হয়ে, বিশ্বের আলো বাতাসের আবহে, নব প্রজন্মের রসিক মনের কল্পনা শক্তি ও শিল্প দক্ষতায় চর্চিত হয়ে চলমান থাকবে বাঙালির কৃষ্টি। দশক হতে দশকে নতুন নতুন মাত্রায় তাকে পাওয়ার আনন্দ আর বিস্ময় উদযাপন করে যাবো আমরা।

বাংলাদেশ সময়: ০৭৩২ ঘণ্টা, এপ্রিল ২, ২০২৫
জেএইচ

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।