ঢাকা, রবিবার, ১৫ ভাদ্র ১৪৩২, ৩১ আগস্ট ২০২৫, ০৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৭

নির্বাচন ও ইসি

শিল্পাঞ্চল পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতি খুলনা-৩ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের

মাহবুবুর রহমান মুন্না, ব্যুরো এডিটর | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২০:৩২, আগস্ট ৩০, ২০২৫
শিল্পাঞ্চল পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতি খুলনা-৩ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের

খুলনা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের মাঠ গোছাচ্ছেন খুলনা-৩ (দৌলতপুর, খালিশপুর ও খানজাহান আলী থানা (আংশিক) আসনের সম্ভব্য সংসদ সদস্য প্রার্থীরা। তারা নিজ নিজ এলাকায় জনসংযোগ বাড়িয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তৎপর অনেকে। শিল্পাঞ্চল খ্যাত এ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নজর বন্ধ শিল্প কলকারখানার শ্রমিকদের দিকে। গণসংযোগে তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন বন্ধ শিল্পকল কারখানা চালুর ব্যাপারে।

খুলনায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দলগুলো। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রচার-প্রচারণা বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে খুলনা-৩ আসনে নির্বাচনের মাঠে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির প্রার্থীর প্রচারণা চোখে পড়ছে।

খুলনা-৩ আসন:
খালিশপুর, দৌলতপুর ও খানজাহান আলী থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত খুলনা-৩ আসন। জাতীয় সংসদের ১০১ নম্বর আসন এটি।  

খুলনা জেলা নির্বাচন অফিসের চলতি বছরের মার্চ মাসের তথ্য মতে, এ আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৫৯ হাজার ৮৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৩, নারী ভোটার ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৩০ ও হিজড়া ভোটার ৫ জন।

সম্ভাব্য প্রার্থী যারা: 
খুলনা-৩ আসনে দলীয় ও নির্বাচনী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও খুলনা মহানগরী আমির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান, মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ তরিকুল ইসলাম এবং নাগরিক পার্টি থেকে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছেন খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ এস এম আরিফুর রহমান মিঠু। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ খুলনা মহানগর সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মুফতি ইমরান হোসাইন। গণঅধিকার পরিষদের সম্ভবও প্রার্থী যুব অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. জনি।

সম্ভাব্য প্রার্থীরা যা বলছেন:
রকিবুল ইসলাম বকুল। বর্তমানে খুলনা বিএনপির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা তিনি। বকুল ১৯৮৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই ফজলুল হক হল ছাত্রদল কর্মী হিসাবে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। এরপর হল কমিটির সহ-সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক, ফজলুল হক হল শাখা ছাত্রদলের নির্বাচিত জিএস, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের দুবার সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। বর্তমানে রকিবুল ইসলাম বকুল বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৩ আসন থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ট হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের দমন, নির্যাতন, মামলা, হামলায় জর্জরিত ছিলেন বকুল। ৫ আগস্টেরর পর বকুল খুলনায় অবস্থান করলেই নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা বকুলের ছবি দিয়ে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন। করছেন সমাবেশও। বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজ করে চলছেন রকিবুল ইসলাম বকুল।

বিএনপির কেন্দ্রীয় ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল বাংলানিউজকে বলেন, আমরা রাজপথে ছিলাম এবং এখনো আছি। বিএনপি নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার আছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনের মোটামুটি একটি রোড ম্যাপ দিয়েছে। তবে নির্দিষ্ট তারিখ দেয়নি। এই মুহূর্তে যদি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে তাহলে সকল প্রস্তুতি নেওয়া আছে আমাদের।

শিল্পাঞ্চল প্রসঙ্গে বকুল বলেন, খুলনা শিল্পাঞ্চলকে এখন আর শিল্পাঞ্চল বলা চলে না। এটা একটা মৃত্যুপুরী। বিগত সরকার লুটপট করে রাতের আঁধারে পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়। তারা শ্রমিকদের কোন দাবি পূরণ করেনি। শ্রমিকদের স্থানচ্যুত করেছে। আমরা শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল। আমরা যদি দায়িত্ব পাই ইনশাল্লাহ মৃত্যুপ্রায় শিল্পনগরীকে আধুনিক শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে তুলবো।

দিনক্ষণ ঠিক না হলেও আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এ নির্বাচনে খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী শিক্ষাবিদ ও জামায়াতের প্রভাবশালী নেতা হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান। নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্তিশালী করাসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন তিনি। প্রতিদিনই এলাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন মাহফুজুর রহমান।

অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের দলের পক্ষ থেকে খুলনা-৩ আসনে কাজ করার জন্য আমাকে বলা হয়েছে। সে হিসেবে কাজ শুরু করেছি। মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের হাওয়া। মানুষ এবার ইসলামের পক্ষের মানুষকে দেখতে চায়। আমরা মানুষের অনুভূতিকে মূল্যায়ন করছি। মানুষের সাথে কথা বলে বুঝতে পারছি তারা শিল্পাঞ্চলের পুনরুদ্ধার চায়। খালিশপুর দৌলতপুর এক সময় শ্রমিকদের কাজে মুখরিত থাকতো এখন সেখানে মৃত্যুপরী। আল্লাহ যদি আমাদের সুযোগ দেয় প্রথম কাজ হবে বন্ধ শিল্পকল কারখানা কিভাবে চালু করা যায়। এর সাথে জড়িতদের কর্মসংস্থান করা। শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা, স্যুয়ারেজ সমস্যাসহ বিভিন্ন সমস্যা যা আছে তার দিকে নজর দেবো। আমরা এখনও আমাদের সেবামূলক কাজের মধ্যে দিয়েও এসব কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। আরও করবো। ইনশাল্লাহ আমরা আশাবাদী মানুষের এ অনুভূতি ধরে রাখতে পারলে জয়ী হতে পারবো।

মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ তরিকুল ইসলাম। শিক্ষাবিদ ও সুবক্তা হিসাবে এলাকায় তার সুখ্যাতি আছে। অর্ধশত মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে। জেলও খেটেছেন বহুবার। হয়েছেন নির্যাতনের শিকার। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এলাকায় গণসংযোগ চালাচ্ছেন অধ্যক্ষ তরিকুল ইসলাম।

অধ্যক্ষ তরিকুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ২০০৮ এবং ২০১৮ সালে মনোনয়ন চেয়েছিলাম। রাজনৈতিক জীবনে সূচনা থেকেই একজন পার্লামেন্টেরিয়ান হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি। ৩৬ জুলাই ২৪ পরবর্তী বাংলাদেশ যেমন প্রার্থী ডিমান্ড করে দলের হাইকম্যান্ড সেটা কার্যকর বিবেচনায় নিলে আমি ১০০℅  আশাবাদী। ইনশাআল্লাহ ধানের শীষ আমার হাতেই তুলে দেবেন আমার নেতা। দলের জন্য আমার অবদান, ত্যাগ, লড়াই সংগ্রামে অকুতোভয় ভূমিকা, নির্বাচনী এলাকায় ভালো ও সৎ সজ্জ্বন মানুষ হিসেবে সুপরিচিতি, মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য ও নিরাপদ  নির্লোভ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা এবং একটা সাইলেন্ট পপুলারিটি এগুলো আমার লড়াইয়ের প্রেরণা। ৫০ এর অধিক মামলা ছিল আমার বিরুদ্ধে। ৭/৮ দফায় প্রায় ১৮ মাস জেলে কাটিয়েছি। একাধিক রাজপথে পুলিশের হামলার শিকার হয়েছি। ২০১২ সালে পুলিশ সরাসরি আমাকে গুলি করে আহত করে, ডান হাত ভেঙে দেয়। কলেজ থেকে বেআইনিভাবে প্রিন্সিপালের চেয়ার থেকে উচ্ছেদ করে। দীর্ঘ ১৫/১৬ বছর বেতন-ভাতা বন্ধ রাখে। মানুষ আমাকে এলাকায় রাতদিন সবসময় তাদের কাছে পায়।

খুলনার প্রবীণ রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এস এম এ রবের ছেলে খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক কোষাধ্যক্ষ এনসিপির সংগঠক এস এম আরিফুর রহমান মিঠু। খুলনার অন্যতম ব্যবসায়ী তিনি। মিঠুর বাবা খুলনা-৩ আসন থেকে একবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। তখন তিনি ৩০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে এস এম আরিফুর রহমান মিঠু এ আসনের প্রার্থী হওয়ার জন্য গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। যে কারণে তার একটি অনুসারীও গড়ে উঠছে। বিএনপি থেকে তিনি এনসিপিতে যোগদান করায় ছাত্রদের কাছে তার গ্রহনযোগ্যতা বেড়েছে।  

আরিফুর রহমান মিঠু বাংলানিউজকে বলেন, আমাদের পাবিবারিক কিছু ভোট আছে খুলনা-৩ আসনে। ১৯৯৬ সালে যে ভোট হয়েছিল সেখানে আমার আব্বা জাতীয় পার্টি থেকে ৩০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। এ ভোট কিন্তু আমার আব্বা ব্যক্তি হিসেবে পেয়েছেন। কেননা এর পরের ভোটে জাতীয় পার্টি ৩ হাজার ভোট পেয়েছে। এরপর ২ হাজার ভোট। এ আসনে এস এম এ রবের ব্যক্তিগত ভোট রয়েছে। এরপর থেকে আমি বিএনপির হয়ে কাজ করেছি। আমরা চাই খুলনার খালিশপুর দৌলতপুরকে নতুনভাবে গড়তে।

শিল্পাঞ্চল সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই খুলনার শিল্পাঞ্চলের খারাপ অবস্থা শুরু। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ মিলে খুলনার বিভিন্ন মিল কলকারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা এ মিলগুলোকে আবার চালু করবো।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ খুলনা মহানগর সেক্রেটারি ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মুফতি ইমরান হোসাইন আসামের শিল্পাঞ্চলে দলীয় একটি প্রভাব রয়েছে। সেই প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি।

মুফতি ইমরান হোসাইন আসাম বাংলানিউজকে বলেন, আমি যদি নির্বাচিত হই ইনশাআল্লাহ সাধ্য অনুযায়ী কাজ করব। বন্ধ শিল্পকর কারখানা চালু করব। মৃত শিল্পাঞ্চল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করব।

গণঅধিকার পরিষদের সম্ভব্য প্রার্থী যুব অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. জনি। তিনি দীর্ঘদিন প্রবাসী ছিলেন। গত কয়েক মাস ধরে নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন সড়কে তার ছবি সম্বলিত ব্যানার পোস্টার লক্ষ্য করা গেছে।

যুব অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. জনি বাংলানিউজকে বলেন, আমিসহ বেশ কয়েকজন প্রার্থী তিন আসন থেকে গণধিকার পরিষ থেকে মনোনয়ন চাইবে। দল যাকে মনোনয়ন দেবে আমি তার পক্ষে কাজ করব। আমি টুকটাক প্রচার-প্রচারণা করছি। বন্ধ শিল্প কারখানা নিয়ে কথা বলছি।

আক্ষেপ করে জনি বলেন, একে একে খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলসহ পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। ভোট এলে প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেয় শ্রমিকদের। বন্ধ কলকারখানা চালুর ব্যাপারে। কিন্তু পরে ভুলে যায়। আল্লাহ যদি আমাদের ওই জায়গায় নেয় আর আমি যদি পাশ করি, তাহলে শিল্পাঞ্চল নিয়ে কাজ করব। বন্ধু কলকারখানা চালুর ব্যাপারে জোরালো ভূমিকা রাখব।

খুলনা-৩ আসনের বিগত নির্বাচনের ফলাফল:
১৯৯১ সালে বিএনপির আশরাফ হোসেন ৩৮ হাজার ৮৭২ ভোট পেয়ে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের কাজী সেকান্দর আলী ৩৯ হাজার ৩৩২ ভোট পেয়ে, ২০০১ সালে বিএনপির আশরাফ হোসেন ৭২ হাজার ২৮৫ ভোট পেয়ে, ২০০৮ সালে ৭৪ হাজার ৬৭৮ ভোট পেয়ে ও ২০১৪ সালে ৪৫ হাজার ৯৫০ ভোট পেয়ে মুন্নুজান সুফিয়ান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।  

এমআরএম/এনডি

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।