ঢাকা: আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করতে পতিত স্বৈরাচারের দোসররা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, এজন্য তারা বিনিয়োগও করেছে বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছি।
বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
এর আগে ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির তথ্য ফাঁস হওয়ার বিষয়ে গত ২৭ মার্চ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তাজুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে এখানে কোনো না কোনো জায়গা থেকে এটা ফাঁস হচ্ছে। এটা আমরা খুব উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, সম্ভবত এই ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো একটা মহল এর সঙ্গে জড়িত বা প্রসিকিউশনের মধ্যে, অফিসেও থাকতে পারে। আমরা বিষয়টাকে গভীরভাবে উদ্বেগের সঙ্গে বিশ্লেষণ করছি এবং তথ্য–প্রমাণ সংগ্রহ করছি। যদি আমরা প্রমাণ পাই যে প্রসিকিউশন অফিসের কেউ, প্রসিকিউশন টিমের সদস্য কেউ, অথবা ট্রাইব্যুনালের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী; যারাই হোক, যারা এ ধরনের তথ্য ফাঁসের সঙ্গে জড়িত হবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।
তার কয়েকদিন পর এসে বৃহস্পতিবারের সাক্ষাৎকারে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা সুনির্দিষ্টভাবে তথ্য পেয়েছি এই আসামিরা এবং পতিত স্বৈরাচারের দোসর, তারা যখন বুঝতে পেরেছে তাদের বিচার যখন অনিবার্য তখন তারা নানা ষড়যন্ত্র করছে। তারা ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করা, জনসম্মুখে হেয় করা, নানান ধরনের গালগল্প সাজিয়ে ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার প্রচেষ্টা নিয়েছে, প্রজেক্ট নিয়েছে, এজন্য তারা বিনিয়োগও করেছে।
তিনি বলেন, এই যে প্রোপাগান্ডার ঝড় সামনে আসবে সে সময় আপনারা যদি ট্রাইব্যুনালের পাশে না থাকেন, তাহলে এই শহীদদের প্রতি সঠিক বিচার করতে কিন্তু তদন্ত সংস্থা বা প্রসিকিউশনের জন্য কঠিন হবে। তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম নানানভাবে সমস্যাগ্রস্ত হতে পারে।
বিচারের সময় প্রসিকিউশন চমক দেখাবে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা যেটা কোর্ট রুমে যখন দেখাবো তখন জাতি বুঝতে পারবে আসলে কী কাজ করেছি। অনেক ধরনের চমক থাকবে। কিন্তু আসলে কী কাজ আমরা করেছি এক্সাক্টলি, এটাও আমাদের একটা বড় বিষয় যে আমরা কিছু বলছি না, মানে মানুষ মনে করছে আমরা কোনো কাজ করি না। তদন্তের সময় যে সমস্ত কাজ করা হয় এটা যদি প্রকাশ্যে আসে তাহলে আসামির পক্ষ, পলাতক পক্ষ, তারা এটাকে নানানভাবে মিসলিড করার চেষ্টা করবে। এটার কারণে ডিফেন্স নেওয়ার চেষ্টা করবে। যেটা আমাদের মামলা পরিচালনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার অহেতুক চেষ্টা করবে। কারণ এখানে ট্রাইব্যুনালের এভিডেন্সগুলো পুরো সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমরা এই সত্যের মাধ্যমে প্রত্যেক আসামির দায়বদ্ধতা কোর্টের মধ্যে প্রমাণ করবো। সুতরাং এ সমস্ত কাজ করে আমাদের থামানো যাবে না। বিচার প্রক্রিয়াকে বানচাল করা যাবে না। প্রশ্নবিদ্ধও করা যাবে না। ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না।
স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১০ সালের ২৫ মার্চ। পরে ২০১২ সালের ২২ মার্চ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুটিকে একীভূত করে আবার একটি ট্রাইব্যুনাল করা হয়।
গত ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের কিছুদিন পরেই ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন চেয়ারম্যান অবসরে যান। আর এক সদস্যকে হাইকোর্টে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। অপর সদস্য অব্যাহতি নেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া প্রসিকিউটররা পদত্যাগ করেন।
পরবর্তীতে গত ৫ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটরসহ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সলিসিটর অনুবিভাগ।
গত ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। এরপর ১৫ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে যোগ দেন তিন সদস্যের বিচারক প্যানেল।
এরপর ট্রাইব্যুনালে জুলাই আন্দোলনে হত্যা, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন অভিযোগ দায়ের করেন ভিকটিমরা। এছাড়া বিগত সরকারের বিভিন্ন সময়ে গুমের অভিযোগও দায়ের করা হয়। ওইসব অভিযোগে এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২৩টি মামলা হয়েছে। এর ভিত্তিতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪৫ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এর মধ্যে তিনটি মামলার আসামি শেখ হাসিনা। পলাতকদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি হয়েছে।
বাংলাদেশ সময়: ২১৫২ ঘণ্টা, এপ্রিল ০৩, ২০২৫
ইএস/এইচএ/