ঢাকা, সোমবার, ১৬ ভাদ্র ১৪৩২, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৭

আন্তর্জাতিক

ট্রাম্প কি ভারতকে চীনের দিকে ঠেলছেন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট: ২১:৪৬, আগস্ট ৩১, ২০২৫
ট্রাম্প কি ভারতকে চীনের দিকে ঠেলছেন?

সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) বৈঠকে যোগ দিতে চীন সফর করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এ সফরে তিয়ানজিন শহরে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার ঘণ্টাখানেক বৈঠক হয়।

বৈঠক সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশও করেছেন মোদী।

বৈঠকের ব্যাপারে মোদী বলেন, গত বছর কাজানে ভারত ও চীনের মধ্যে অত্যন্ত গঠনমূলক আলোচনা হয়েছিল, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন ইতিবাচক ধারায় এগিয়ে নিয়েছে। সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহারের ফলে এখন শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

মোদীর বক্তব্যে মানস সরোবর যাত্রা থেকে চীনের সঙ্গে সরাসরি বিমান পরিষেবা চালুর প্রসঙ্গটি উঠে আসে। গালওয়ান সীমান্ত সংঘাতের পর এটিই দুই দেশের মধ্যে প্রথম শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক। আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। ওই সংঘাতের পর দুই দেশের সম্পর্ক জোড়া লাগছে, এমনটিই মনে হচ্ছে।  

চীনের প্রতি বার্তায় মোদী বলেন, ভারত ও চীনের সম্পর্কের ওপর ২০৮ কোটি মানুষের স্বার্থ জড়িত। এতে গোটা পৃথিবীরই কল্যাণ হবে। পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান ও সংবেদনশীলতার ভিত্তিতেই আমরা এ সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে চাই।

চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও বৈঠকে দুই দেশের সুসম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি এসসিও সম্মেলনের জন্য মোদীকে চীনে স্বাগত জানান। শি বলেন, গত বছর কাজানে আমাদের বৈঠক অত্যন্ত সফল হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্ব এক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। চীন ও ভারত শুধু বিশ্বের দুই বৃহত্তম জনবহুল দেশই নয়, তারা প্রাচীন সভ্যতারও ধারক। তাই বন্ধুত্ব এবং প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি। ড্রাগন আর হাতির ঐক্য আজ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

এসসিও বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও। ভারত ও চীনের পাশাপাশি রাশিয়ার উপস্থিতি এ সম্মেলনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির কারণে ভারতের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপ— যা কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মোড় আনতে পারে।

জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মইদুল ইসলাম বলেন, প্রতিবেশীকে পরিবর্তন করা যায় না— তাই সুসম্পর্ক বজায় রাখা উভয় দেশের জন্যই মঙ্গলজনক। তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে ভারত ও চীনের ওপর শুল্কের চাপ সৃষ্টি করেছেন, তাতে নয়াদিল্লি নিজেদের অবহেলিত বা বঞ্চিত মনে করছে। আলোচনা চললেও ভারতের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, অথচ পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তেমন কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়নি। আবার চীনের বিরুদ্ধেও আরও কড়া শুল্ক আরোপের ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষজ্ঞের ধারণা, এই পরিস্থিতিই ভারত-চীনের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ হওয়ার নতুন এক সুযোগ এনে দিয়েছে।

সম্প্রতি ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বছরের শুরুর দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন চীনের বিরুদ্ধে শুল্কযুদ্ধ ঘোষণা করেন, তখন চীনা প্রেসিডেন্ট ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে একটি ব্যক্তিগত চিঠিও লিখেছিলেন। বেজিংয়ের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ আগেই নেওয়া হয়েছিল।

ভারতীয় সিনিয়র সাংবাদিক দীপ্তেন্দ্র রায়চৌধুরী ডয়চে ভেলেকে বলেন, এখনকার ঘটনাপ্রবাহে মৈত্রীর উদ্যোগ স্বাভাবিক। শত্রুর শত্রুই মিত্র। চীনের সঙ্গে ভারতের প্রবল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। চীন পাকিস্তানের হয়ে কাজ করছিল, ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিয়েছিল। এখন তারা বিষয়টা বুঝতে পেরেছে, তাই সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পদক্ষেপ নিয়েছে।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনছেন। যা করছেন, তাতে আমেরিকা ধীরে ধীরে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এর ধাক্কা অর্থনীতিতেও পড়বে। ভারত থেকে তুলনায় অনেক বেশি তেল চীন কিনছে রাশিয়ার কাছ থেকে। ইউরোপের দেশগুলোও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ট্রাম্প ভারতকে নিশানা করছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছেন। এর পেছনে তার একটি অশুভ অ্যাজেন্ডা স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার কারণেই ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইউক্রেন যুদ্ধের পেছনে ভারতের এ ভূমিকা দায়ী। অন্যদিকে চীনের ওপর আরোপ করা হয়েছে ৩১ শতাংশ শুল্ক। চীন যদি এবার বিরল আর্থ ম্যাগনেট রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে ট্রাম্প ২০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর পথে হাঁটতে পারেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক রাজাগোপাল ধর চক্রবর্তী বলেন, ট্রাম্পের যুক্তি দুর্বল। ভারতকে তিনি টার্গেট করছেন, অথচ রাশিয়ার ক্ষেত্রে ততটা কঠোর নন। এ ধরনের নীতি ভারতের জন্য ভয়ংকর হতে পারে। যদি ভারত-চীনের ব্যবসা বাড়ে, তাহলে ভারতের আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমে যাবে। তবে এখানেও চ্যালেঞ্জ আছে।

ব্রিকস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে ব্রিকস মুদ্রা প্রবর্তনের চিন্তা হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন চাপের মুখে দেশগুলো সরে আসে। তখন আমেরিকা হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, যারা ব্রিকস মুদ্রা ব্যবহার করবে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না। বর্তমানে বিশ্বের ৬৫ শতাংশ বাণিজ্য হয় মার্কিন ডলারের মাধ্যমে। আমেরিকার বাণিজ্যে ঘাটতি থাকলেও ডলার ছাপানোর ক্ষমতা থাকায় তারা চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে ভারত, চীন, রাশিয়া যদি এক অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থার দিকে এগোয়, তাহলে আমেরিকার ওপর চাপ তৈরি করা সম্ভব হবে।

এমজে

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।